পরীক্ষামূলক প্রচার...
Mohajog-Logo
,
সংবাদ শিরোনাম :

রাষ্ট্রপতির মজার ও জরুরি ভাষণ এবং ডাকসুর নির্বাচন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ১০০ বছর (১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত) ছুঁতে আর খুব বেশি বাকি নেই। এরই মধ্যে গত শনিবার অনুষ্ঠিত হলো এর ৫০তম সমাবর্তন। এই অনুষ্ঠানে দেওয়া রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ভাষণ সবার মনযোগ কেড়েছে। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যও। শুধু অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রোতারাই নন, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে আমরা অনেকেই তাঁর ভাষণ ‘উপভোগ’ করেছি।

রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ ছিল সত্যিই উপভোগ করার মতো। নিজের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার ও অকপট বক্তব্য ভাষণটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। আমরা পরিচয় পাই তাঁর সেন্স অব হিউমারের। কোনো রাখঢাক না করেই বলেছেন তাঁর ব্যক্তিজীবনের কথা। ‘আমার নিজের কাছেই অবাক লাগে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। ৬১ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছি, থার্ড ডিভিশন। ইন্টার পাস করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসলাম, কিন্তু ভর্তি তো দূরের কথা, ভর্তির ফরমটাও আমাকে দেওয়া হয় নাই। বন্ধুবান্ধব অনেকে ভর্তি হলো, আমি ভর্তি হলাম গুরুদয়াল কলেজে।…কিন্তু আল্লাহর কী লীলাখেলা, বুঝলাম না, যেই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইতে পারলাম না, সেইখানে আমি চ্যান্সেলর হইয়া আসছি। বাংলাদেশে যতগুলি পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সবগুলির আমি চ্যান্সেলর।’ তাঁর এই বক্তব্য আমাদের আনন্দ দিয়েছে, উৎসাহ ও উদ্দীপনা জুগিয়েছে।

একই ভাষণে তিনি খুবই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। আমাদের রাজনীতিবিদেরা দিনের পর দিন এগুলোকে উপেক্ষা করে আসছেন। তিনি বলেছেন, ‘ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নির্বাচন ইজ আ মাস্ট। নির্বাচন না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে শূন্যতার সৃষ্টি হবে।’ ছাত্ররাজনীতির বর্তমান দশা নিয়ে নিজের হতাশাকে তিনি লুকিয়ে রাখেনি। বলেছেন, ছাত্ররাজনীতির বর্তমান হালচাল দেখে মনে হয়, এখানে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের প্রাধান্য বেশি। গণতন্ত্রের ভিতকে মজবুত করতে হলে দেশে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। আর ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমেই সেই নেতৃত্ব তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন। ‘কিছু ক্ষেত্রে অছাত্ররাই ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্ব দেয়, নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে ছাত্ররাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের, এমনকি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা, সমর্থন ও সম্মান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। এটি দেশ ও জাতির জন্য শুভ নয়।’

যে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতির নেতৃত্ব গড়ে ওঠার কথা, সেখানেই যে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বড় ফাঁস দিয়ে রেখেছে। শুধু ডাকসু নয়, ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন’ বলে আর কিছু নেই। অছাত্রদের ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বে আসার সুযোগ করে দিয়েছে এই ছাত্র সংসদ নির্বাচনবিহীন পরিস্থিতি। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ও নব্বই-পরবর্তী নতুন গণতান্ত্রিক সূচনার ক্ষেত্রে সুসংগঠিত ছাত্ররাজনীতি, ডাকসু ও ছাত্র সংসদগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। নব্বইয়ের পর গণতন্ত্র এল, নির্বাচন ফিরে এল, কিন্তু হারিয়ে গেল ছাত্র সংসদ নির্বচন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের নির্বাচনই হয়। শিক্ষক সমিতি নির্বচন, কর্মকর্তা সমিতির নির্বচন বা কর্মচারী সংগঠনের নির্বাচন—কিছুই বাদ নেই। শুধু ডাকসুর নির্বাচন হয় না। অথচ বছর বছর ডাকসুর নামে চাঁদা উঠছে। পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক শাসনের সময়ে, জিয়াউর রহমান ও এরশাদের মতো সামরিক স্বৈরশাসকদের আমলে নির্বাচন হয়েছে আর নব্বই-পরবর্তী গণতন্ত্র ডাকসুর নির্বাচনের কবর দিয়েছে। গত ২৭ বছরেও কোনো সরকার ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেওয়ার সাহস পেল না!

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নব্বই-পরবর্তী সরকারগুলোর এই অবস্থানের কারণটি স্পষ্ট। যখন যে দলই ক্ষমতায় থেকেছে, তারা কখনো ভরসা পায়নি যে ডাকসু নির্বাচনে তাদের সমর্থক ছাত্র সংগঠন জিতবে। ফলে কোনো ঝুঁকিও নয়, নির্বাচনও নয়। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ টানা সাত বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। বিরোধী দল কার্যত এখন আর কিছু নেই। সরকারের দমন-পীড়ন আর নিজেদের ভুল রাজনীতিতে বিএনপি দলীয় ও সাংগঠনিক শক্তি হারিয়েছে। দলের যখন এই অবস্থা, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের অস্তিত্বই প্রায় চোখে পড়ে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ এখন এতটাই শক্তিশালী ও আকারে-আয়তনে এতই বড় যে নিজেদেরই নিয়মিত মারামারি ও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে।

এরপরও ডাকসু নির্বচন নিয়ে সরকারের এত ভয় কেন? রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘ডাকসু নির্বাচন ইজ আ মাস্ট। নির্বাচন না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে শূন্যতার সৃষ্টি হবে।’ ২৭ বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী এর খেসারত মানে নেতৃত্বের সংকটে আমরা ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছি। সমানে নির্বচন অনুষ্ঠান না করার অর্থ দাঁড়াবে দেশকে পর্যায়ক্রমে নেতৃত্বশূন্য করার পথে হাঁটা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি যখন ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর নির্বাচনকে ‘মাস্ট’ বলেছেন, তখন সরকার কী উদ্যোগ নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।

এ কে এম জাকারিয়া, প্রথম আলো

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *