পরীক্ষামূলক প্রচার...
Mohajog-Logo
,
সংবাদ শিরোনাম :

ডিএসইর মালিকানায় আসছে দুই চীনা এক্সচেঞ্জ

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক-চতুর্থাংশ শেয়ার কিনতে চায় চীনের শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের যৌথ কনসোর্টিয়াম।

চীনের এ দুটি স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম ৯৯০ কোটি টাকায় ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার (প্রতিটি ২২ টাকা দরে) কিনে নেওয়ার প্রস্তাব করেছে। একইসঙ্গে ডিএসইর কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ৩০০ কোটিরও বেশি টাকা (৩৭ মিলিয়ন ডলার) খরচ করবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করেছে তারা।

কৌশলগত অংশীদার পেতে তিন মাস আগে ডিএসই যে দরপত্র আহ্বান করে, তাতে সাড়া দিয়ে চীনের এই দুই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম ওই প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের সঙ্গে ভারত, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি কনসোর্টিয়ামও প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে সাংহাই ও শেনচেন স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবই আকর্ষণীয় হয়েছে বলে ডিএসইর একজন পরিচালক জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার বিকালে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ দরপত্র উন্মোচন করেছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামটি ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ারের প্রতিটির জন্য ২২ টাকা হারে দরপ্রস্তাব করেছে। এ হিসাবে তারা ডিএসইর ১৮০ কোটি শেয়ারের এক-চতুর্থাংশ বা ৪৫ কোটি শেয়ারের জন্য প্রায় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। পর্ষদে তাদের একজন পরিচালক রাখার প্রস্তাব রয়েছে। কৌশলগত অংশীদার হতে পারলে এ বিনিয়োগকারীরা ১০ বছর ডিএসইকে প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহায়তা দেবে, যার আর্থিক মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

এদিকে এনএসইর নেতৃত্বাধীন অন্য কনসোর্টিয়ামটিতে ইকুইটি পার্টনার হিসেবে রয়েছে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স পরিচালিত প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড ফ্রন্টিয়ার ফান্ড বাংলাদেশ এলএলপি আর টেকনোলজিক্যাল পার্টনার হিসেবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সচেঞ্জ জায়ান্ট নাসডাক। এ গ্রুপটি ডিএসইর ২৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ শেয়ারের প্রতিটির জন্য ১৫ টাকা হারে দরপ্রস্তাব করেছে। তাদের কাছ থেকে ডিএসই পাবে ৬৭৫ কোটি টাকার কিছু বেশি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিচালনা পর্ষদ উভয় কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিবেচনা করে দেখছে। কাদের প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। আগামী শনিবার পর্ষদ সভার পর এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে ব্রিফ করারও পরিকল্পনা করছেন স্টক এক্সচেঞ্জটির কর্মকর্তারা।

এদিকে ডিএসইর সব স্তরের সদস্যদের মধ্যে দুই পক্ষের প্রস্তাবের চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে অবগত ডিএসইর একাধিক সিনিয়র সদস্য জানিয়েছেন, টাকার অংকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনা কনসোর্টিয়ামটিই এগিয়ে। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও তারা পিছিয়ে নেই। অভিজ্ঞতায়, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোর প্লাটফর্ম গঠনে তাদের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। দক্ষিণ এশিয়ায় তারা এরই মধ্যে পাকিস্তানের স্টক এক্সচেঞ্জে কৌশলগত বিনিয়োগ করেছে। আঞ্চলিক বিনিয়োগের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও আশা করা যায়, ডিএসইতে তাদের বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি হবে। সব মিলিয়ে ডিএসইর বেশির ভাগ সদস্যই চীনা প্রস্তাবটির পক্ষে।

অন্যদিকে একটি প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড অংশীদার হওয়ায় এনএসইর নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের কিছু বিনিয়োগ ডিএসইর পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গেও উঠে যেতে পারে। তবে ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন অনুসারে, অন্য কৌশলগত বিনিয়োগকারীর কাছেই তাদের শেয়ারগুলো বিক্রি করতে হবে। মূল কৌশলগত অংশীদার এনএসই আবার ভারতের বাজারে অল্প সময়ে এক্সচেঞ্জ ব্যবসা বাড়িয়ে সাফল্য দেখিয়েছে। সে কোম্পানির ৪৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক গোল্ডম্যান স্যাকস, মরগান স্ট্যানলি, মেরিল লিঞ্চসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন বিনিয়োগ ব্যাংক। বাংলাদেশের বাজার থেকে তারাও খুব তাড়াতাড়ি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেবে— এমনটি মনে হচ্ছে না। আশা করা যায়, সাংস্কৃতিক নৈকট্যের কারণে ভারতে এক্সচেঞ্জ উন্নয়নে তাদের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশে ফল দেবে। এছাড়া এ কনসোর্টিয়ামের টেকনোলজিক্যাল পার্টনার নাসডাক একটি বিশ্বসেরা নাম। তবে ডিএসইর প্রতিটি শেয়ারের জন্য মাত্র ১৫ টাকাকে যথেষ্ট মনে করছেন না সিংহভাগ সাধারণ সদস্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর আরেক সদস্য বলেন, ডিএসই পর্ষদের উচিত হবে নগদ অর্থের বাইরে অন্যান্য বিষয়কেও বিবেচনায় নেয়া। দুই পক্ষের প্রস্তাবের যথাযথ বিশ্লেষণ করে স্টক এক্সচেঞ্জের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কোনটি বেশি ভালো সেটি খোঁজা, কারা ডিএসইকে একটি বিশ্বমানের এক্সচেঞ্জ হতে সাহায্য করবে তা বিবেচনা করা। চূড়ান্ত সম্মতি দেয়ার আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিও তাদের বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োগ করবে আশা করি।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১ জুন খোলা দরপত্রে ডিএসইর প্রতিটি শেয়ারের জন্য ৩০ টাকার বেশি দরপ্রস্তাব করেছিল লংকাবাংলা ফিন্যান্স ও ডেল্টা লাইফের নেতৃত্বাধীন একটি স্থানীয় কনসোর্টিয়াম। কারিগরি সমর্থনের জন্য তারা ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। সে দফায় ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সের নেতৃত্বাধীন বিদেশী কনসোর্টিয়ামটি ডিএসইর এক্সচেঞ্জ ব্যবসাটিকে আলাদা করে শুধু এর শেয়ার কেনার জন্য দরপ্রস্তাব করেছিল। তবে ডিএসইর সদস্য ও পর্ষদের অনিচ্ছায় কোনো প্রস্তাবই গৃহীত হয়নি। স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের আবেদনক্রমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের কৌশলগত বিনিয়োগকারী খোঁজার জন্য আরেক দফা সময় বাড়িয়ে দেয়। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে কৌশলগত বিনিয়োগ চূড়ান্ত করতে হবে স্টক এক্সচেঞ্জটিকে।

প্রসঙ্গত, ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন ২০১৩ অনুসারে মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথক করার পর স্টক এক্সচেঞ্জের ২৫ শতাংশ শেয়ার কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনক্রমে এ হার বাড়ানো যেতে পারে। কৌশলগত বিনিয়োগকারী বলতে আইনে সেসব প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে, যারা ইকুইটি বা টেকনোলজিক্যাল পার্টনার হিসেবে পর্ষদে থেকে ডিএসইকে একটি আধুনিক এক্সচেঞ্জে উন্নীত করতে সাহায্য করবে। তাদের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেবে নীতিনির্ধারকরা।

চীনের প্রধান তিনটি স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে সাংহাই ও শেনচেন রয়েছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে। বাজার মূলধনের দিক থেকে বিশ্বের সেরা ১০টি স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাতেও রয়েছে তারা। সাংহাই স্টক একচেঞ্জের বাজার মূলধন সাড়ে তিন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। শেনচেন স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন দুই দশমিক দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অপরদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন চার লাখ ১৩ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *