পরীক্ষামূলক প্রচার...
Mohajog-Logo
,
সংবাদ শিরোনাম :

তামাক ছেড়ে গমে বাম্পার ফলন

ধানের পরেই খাদ্যশস্যের তালিকায় রয়েছে গম। কুষ্টিয়ায় একসময়ে প্রচুর পরিমাণে গম চাষ হতো। তবে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ আর তামাকের দাপটে বন্ধ থাকে গম চাষ। ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে ব্যাপক আকারে ক্ষতিগ্রস্থ হয় গম চাষিরা। এর পরেই তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় গম চাষ থেকে। তবে বিগত বছরের তুলনায় এ বছর কুষ্টিয়ায় রেকর্ড পরিমাণ গম চাষ হয়েছে।

২০১৫-১৬ মৌসুমে কুষ্টিয়াসহ যশোর অঞ্চলের ৫ জেলায় (কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও ঝিনাইদহ) মহামারী আকার ধারণ করে ছত্রাকজনিত রোগ ব্লাস্ট। পরের মৌসুমে এই ৫ জেলায় গম চাষের নিষেধাজ্ঞা দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এরপরেও কয়েকজন কৃষক নিশেধাজ্ঞা অমান্য করে গম চাষ করে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কৃষকরা প্রায় মুখ ফিরিয়ে নেয় গম চাষ থেকে। পরে এসব গম চাষের জমি দখল করে নেয় বিষবৃক্ষ তামাক।

তবে এ বছর কৃষি অফিসের পরামর্শে তামাক ছেড়ে আবারো গম চাষ করছেন কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া থাকায় গমও ভালো হয়েছে। এ বছর জেলায় কোথাও ব্লাসের আক্রমণ দেখা দেয়নি। তবে কিছু স্থানে দেখা দিয়েছে মরিচা রোগ। তবে কৃষি অফিসের তৎপরতায় তা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছেন কৃষকরা। বর্তমানে রোগটি কৃষি বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

কুষ্টিয়া জেলা শহর থেকে দূরে মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা মিরপুর ও দৌলতপুর। কুষ্টিয়ার অনান্য উপজেলার তুলানায় এ উপজেলা দুটিতে ২০১৫ সালে দেখা দেয় ব্লাস্ট রোগ। এর ফলে কমে যায় গমের উৎপাদন। কৃষকরা গম চাষের পরিবর্তে তামাক চাষ শুরু করে। কিন্তু এ বছর চিত্রটা পাল্টে গেছে। বিগত দিনের মতো চাষিরা ঝুঁকেছে গম চাষে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে তারা গম চাষ করেছেন। কৃষি অফিসের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ গম চাষ হয়েছে।

মিরপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৬-১৭ মৌসুমে ব্যাপক হারে গমে ব্লাসের আক্রমণ হয়। ২০১৭-১৮ মৌসুমে আমরা কৃষকদের গম চাষে নিরুৎসাহিত করি। যার কারণে কৃষকরা অনেকটা ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যায়। ২০১৮-১৯ মৌসুমে মিরপুর উপজেলায় ৪১৩ হেক্টর জমিতে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। চাষ হয় প্রায় ৬৫০ হেক্টর। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬৫০ হেক্টর জমিতে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চাষ হয়েছে প্রায় ১৩৫০ হেক্টর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তদরের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ মৌসুমে কুষ্টিয়া জেলায় ১৬ হাজার ৬৮৮ হেক্টর জমিতে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। চাষ হয়েছিলো প্রায় ১৬ হাজার ৭১০ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছিলো ৫০ হাজার ১৩০ মেট্রিকটন।

২০১৬-১৭ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৮৩০ হেক্টর। চাষ হয়েছিলো প্রায় ৪ হাজার ৩৭০ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছিলো ১৫ হাজার ৭৩২ মেট্রিকটন। সে বছর ব্লাসের আক্রমণ দেখা দেয়। এর ফলে ২০১৭-১৮ মৌসুমে কুষ্টিয়া জেলায় গম চাষে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

২০১৮-১৯ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১০ হাজার ৩৬৮ হেক্টর। চাষ হয়েছিলো প্রায় ৯ হাজার ২৯৫ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছিলো ৩৬ হাজার ২৫০ মেট্রিকটন। চলতি ২০১৯-২০ মৌসুমে জেলায় গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ১১ হাজার ৫০৫ হেক্টর, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৭১৫ মেট্রিকটন। গমের আবাদ ভালো হওয়ায় উৎপাদন বলে আশা করছেন ৪৫ হাজার ৪০০ মেট্রিকটনের উপরে।

চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ গমের চাষ হয়েছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ৫ হাজার ৩৮৭ হেক্টর, ভেড়ামারায় ১ হাজার ৬শ হেক্টর, মিরপুরে ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর, কুমারখালীতে ১ হাজার ৫৫০ হেক্টর, কুষ্টিয়া সদরে ১ হাজার ১৫০ হেক্টর এবং খোকসা উপজেলায় ৪৬৮ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে গম।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার কচুবাড়ীয়া এলাকার গমচাষি আয়নাল হক জানান, গমে রোগ হওয়ার কারণে কয়েক বছর আগে অনেক ক্ষতি হয়েছিলো। কৃষি অফিসের লোকজন এসে গম চাষ নিষেধ করেছিল। এজন্য গম চাষ করিনি। জমি তামাকের জন্য বর্গা দিয়েছিলাম। কিন্তু এ বছর আবারো গম চাষ করতে বলেছে, সকলেই তাই গম চাষ করেছি। এ বছর বেশ ভালো গম হয়েছে। দুই বছর এই জমিতে গম চাষ বন্ধ করে রেখেছিলাম। এত সুন্দর গম আগে কখনো হয়নি। এবার বেশ ভালো ফলন পাবো বলে আশা করছি।

একই এলাকার কৃষক জুমির আলী জানান, আমি এক বিঘা জমিতে এ বছর গমের চাষ করেছি। ব্লাস রোগের আক্রমণ হয়নি। তবে পাতায় মরিচা পড়ার মতো দেখা যাচ্ছে।

মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের কাকিলাদহ এলাকার কৃষক কামরুজ্জামান জানান, গত বছর আমার জমিতে তামাক ছিলো। এ বছর দেড় বিঘা জমিতে গম চাষ করেছি। গম বেশ ভালো হয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় এলাকায় গম চাষ বেড়েছে।

মিরপুর উপজেলার চিথলিয়া এলাকার কৃষক মাজেদুল হক জানান, এ বছর আমি ৬ বিঘা জমিতে বারি-২৮ এবং বারি-৩০ জাতের গম চাষ করেছি। অনান্য বছরের তুলনায় গম খুব ভালো হয়েছে। তবে কিছুদিন আগে গমের পাতার মরিচা রোগ দেখা দেয়। উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা সুকেশ রঞ্জন পালের পরামর্শে আমি নাটিভো নামের একটা ছত্রাকনাশক স্প্রে করি। এতে বেশ ভালো ফল পাই। আশা করছি গমে বেশ ভালো লাভ হবে।

দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া এলাকার কৃষক ফরিদ আহম্মেদ জানান, দুই বছর আগে গম চাষ করেছিলাম। রোগে গম নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। এ জন্য লোকসান হয়েছিলো। পরের বছর আর গম চাষ করিনি। কিন্তু এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে আমি এক বিঘা জমিতে গম চাষ করেছি। বেশ ভালো হয়েছে। এবার কোন রোগও হয়নি। আশা করছি গত দুই বছরের লোকসান এবার পুশিয়ে যাবে।

ভেড়ামারা উপজেলার ঠাকুর দৌলতপুর এলাকার কৃষক দেলোয়ার হোসেন জানান, ব্লাসের কারণে দুই বছর গম আবাদ করিনি। এবার দুই বিঘা জমিতে গম আবাদ করেছি। আগের চেয়ে বেশ ভালো হয়েছে। রোগবলাই লাগেনি, দানাও বেশ ভালো।

মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, এ বছর মিরপুর উপজেলায় রেকর্ড পরিমাণ গমের চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে ৬৫০ হেক্টর জমিতে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু মিরপুর উপজেলায় গম চাষ হয়েছে প্রায় ১৩৫০ হেক্টর জমিতে। ২০১৫ সালে এই অঞ্চলে গমে ব্লাস্টের আক্রমণ মহামারী আকার ধারণ করে। সেসময় কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পরবর্তী বছর ২০১৬ সালে আমরা এই এলাকায় গম চাষে নিষেধাজ্ঞা জারি করি। এতে ব্লাস্টের প্রাদুর্ভাব কম হয়।

তিনি আরো বলেন, গত বছর থেকে আমরা আবার গম চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। তারা আবার গম চাষে আগ্রহ দেখিয়েছে। কিছু কিছু জমিতে স্বল্প পরিমাণে গমের পাতায় মরিচা রোগ দেখা দেয়। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে তা প্রায় নিয়ন্ত্রণ করেছি ফেলেছি।

তিনি জানান, এই অঞ্চলের মাটি গম চাষের জন্য উপযুক্ত। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী জাতের গম চাষের জন্য পরামর্শ দিচ্ছি।

কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) রঞ্জন কুমার প্রামানিক জানান, এ বছর জেলায় গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। আমরা ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ যাতে না হয়, এ জন্য কৃষকদের বীজ শোধন করে বপন করিয়েছি। জেলাজুড়ে কোথাও ব্লাস্টের কোন আক্রমণ দেখা দেয়নি। এছাড়া এ বছর গম চাষের আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। রোগবলাইও আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তিনি বলেন, গম চাষে আমরা কৃষকদের সার, বীজ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করছি। সেই সাথে আমরা আধুনিক উপায়ে গম চাষের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *