1. sardardhaka@yahoo.com : adminmoha :
  2. mohajog@yahoo.com : Daily Mohajog : Daily Mohajog
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন

অনুভবে বঙ্গবন্ধু

মহাযুগ নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২০
  • ৬৪ বার

১৯৭৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আলজিয়ার্সে ৭৩ জাতি জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বললেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’

এই সম্মেলনে কিউবার রাষ্ট্রনায়ক মহান বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি; কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।

আজ বাংলাদেশে শোষিত বঞ্চিত মানুষেরা কেমন আছেন। ঘুষ, দুর্নীতি, জনতুষ্টিবাদ, কর্তৃত্ববাদ সমাজকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। মানুষের শান্তিতে নিরাপদে বেঁচে থাকাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অবস্থাটা এমন রোগীর সর্বাঙ্গে ঘা ঔষধ দেয়ার জায়গা নেই। কপালে ফোড়া হলে অন্য জায়গার মতো পরিধেয় আবৃত করে গোপন করা যায় না। আমাদের সমাজের কপালে ফোড়া। ঢেকে রাখার উপায় নেই।

১৯৭৪ সালের বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, চাটাদের দিয়ে আর কাজ হবে না। রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েই তিনি দ্বিতীয় বিপ্লব অর্থাৎ শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ‘বাকশাল’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বাকশাল প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, আমার দুঃখী মানুষ যেন গণতন্ত্রের স্বাদ পায়। আমার গণতন্ত্র পশ্চিমা গণতন্ত্রের মত বৈষম্যমূলক এবং শোষণের হাতিয়ার হবে না।

বাকশাল ঘোষণার কয়েক মাস পরে (তারিখটা এখন ঠিক মনে নেই) জাতীয় প্রেসক্লাবের উল্টোদিকে তোপখানা রোডে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) অফিসের দোতলা বিল্ডিংয়ের পেছনের বড় টিনশেডের সভা কক্ষে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সারাদেশ থেকে সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী এবং দলীয় নেতাদের সভা আহবান করেন।

সভা কক্ষটি একেবারেই পরিপূর্ণ। ন্যাপের একজন কর্মী হিসেবে আমিও সেই সভায় উপস্থিত ছিলাম। যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন।

সভার বক্তা একজনই অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। দীর্ঘ সময়য়ের বক্তৃতায় বাকশালের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে বললেন, আমার বন্ধু মুজিব যে পথ গ্রহণ করেছে, তা অত্যন্ত কঠিন। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক শত্রুরা এখন আরো বেশি তৎপর। এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে বিচক্ষণতার সাথে পথ চলতে হবে। মুজিব বেমবেল্লা হবেন না ফিদেল ক্যাস্ট্রো হবেন ইতিহাসই সে কথা বলে দেবে। আমরা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতই বঙ্গবন্ধুকে দেখতে চাই।

বক্তৃতা শেষ। যে যার গন্তব্যে চলে গেছেন।

একের পর এক ষড়যন্ত্র ঘনীভূত হচ্ছে। বন্ধুপ্রতিম কয়েকটি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক থাকতে বললেন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদসহ ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্ধুরাও বঙ্গবন্ধুকে একই কথা বললেন। বঙ্গবন্ধু এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে কোনো বাঙালি তাঁর বুকে আঘাত করতে পারে একথা তিনি কখনো বিশ্বাস করতে চাননি।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুকে সম্বর্ধনা দেয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন। কিন্তু হায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের ১৫ আগস্টের নতুন দিনের নতুন সূর্য আর দেখা হলো না।

আমি তখন আমার গ্রামের বাড়ি তুষখালীতে। খুব সকালেই একজন এসে তাড়া দিয়ে বললেন রেডিওর খবর শুনুন। খবর শুনে হতভম্ব। বাকরুদ্ধ। মনে পড়ে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সেদিনের বক্তৃতার শেষ কটি লাইন।

সত্তর দশকে সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে সমাজতন্ত্রমুখী রাষ্ট্রনীতি রুখে দেয়ার জন্য জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দকে হত্যা করেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা ছিল তাদেরই নীল নকশা। তুষখালীতে থাকা নিরাপদ নয় মনে করে ঢাকায় চলে এলাম। কোথাও কোনো প্রতিবাদ নেই। মিছিল নেই। সবকিছুই যেন শুনশান।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জীবনে দুঃখের দিন। শোকের দিন। রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার দিন। ববন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে খুনিরা সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশকে ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত ধারাকে উল্টা পথে টেনে নেয়ার এক অশুভ যাত্রা শুরু করে। খুনি মোস্তাক পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারার দিকে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টা চালায়। ৭২ এর সংবিধানের যে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়েছিল, জিয়াউর রহমানের কলমের খোঁচায় তা বাতিল হয়। রাষ্ট্রীয় ৪ মূলনীতির থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি মুছে ফেলা হয়। এরশাদের এসে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো সংবিধানে যুক্ত করে দেয় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।

আজ অনেকে অনেক বড় কথা বলেন। যেদিন বঙ্গবন্ধু সপরিবারে ঘাতকদের হাতে নিহত হলেন সেদিন প্রতিবাদ করার জন্য কারো দেখা মেলেনি। জাতির জনকের হত্যার পর ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীরাই প্রথম প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল। ১৯৭৫এর ৪ নভেম্বর সুদীর্ঘ এক নীরব মিছিলের কথা হয়তো এখনো অনেকের মনে আছে। বামপন্থীদের উদ্যোগেই সেদিন সকাল ১০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় সমবেত হয়েছিলেন সহস্রাধিক ছাত্র-জনতা। বক্তৃতা করেছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তার বক্তৃতা শেষে বিশাল শোক মিছিলের যাত্রা শুরু হয় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটির অভিমুখে। শোকের মিছিল। বেদনার মিছিল। বঙ্গবন্ধুর অন্যতম বন্ধু ন্যাপ নেতা পীর হাবিবুর রহমানসহ ন্যাপের অনেক নেতৃবৃন্দ ছিলেন এই মিছিলের পুরোভাগে। মিছিলের পক্ষ থেকে ৩২ নম্বর বাড়ির গেটে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। ফেরার সময় মিছিলটি আর নীরব থাকেনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে ঢাকার রাজপথে বজ্রনিনাদসহ স্লোগান ধ্বনিত হয়েছিল বামপন্থীদের কন্ঠে ‘মুজিব হত্যার বিচার চাই।’

এরপর থেকে ঘটনাপ্রবাহের একপর্যায়ে সারাদেশে বামপন্থীরা গ্রেপ্তার হন। আমিও গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ হই। এক সময় ঢাকা থেকে দুটি বাসভর্তি রাজবন্দীদের বরিশাল জেলখানায় স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেও দেখা মেলে ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের সাথে। ন্যাপ নেতাদের মধ্যে ছিলেন নিরোধ নাগ, আলী হায়দার খান, মানবেন্দ্র বটব্যাল, ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের মধ্যে কাশীনাথ দত্ত, তপন বোস প্রমুখ।

সারাদেশের অনেক ন্যাপ নেতা এবং ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা তখন কারারুদ্ধ হয়ে ছিলেন। অনেক বামপন্থীকেই আত্মগোপনে যেতে হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৭১এর ৮ ডিসেম্বর মুক্ত বাংলাদেশে যশোরের জনসভায় ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলেছিলেন, ‘নবলব্ধ স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনকে ভিত্তি করে আওয়ামী লীগের একক সরকার গঠন করা ঠিক হবে না। এখন দেশপ্রেমিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং জাতীয় স্বাধীনতাকে সকল হামলা এবং চক্রান্ত থেকে রক্ষা করার স্বার্থে জাতীয় সরকার গঠনের সম্মিলিত হওয়া দরকার। না হলে স্বাধীনতার উপর কোনো বিপদ এলে এককভাবে কোনো দল প্রতিহত করতে পারবেন না। আমাদের মনে রাখতে হবে, সম্মুখযুদ্ধে একটি দেশের হানাদার বাহিনী শুধু পরাজিত হয়েছে কিন্তু দেশের ভিতরে প্রতিবিপ্লবীদের চক্রান্তে সাম্রাজ্যবাদী সামন্তবাদী বহিঃশত্রুর মদদ দান বন্ধ হয়নি। তারা নতুন করে চক্রান্ত আটছে। জাতীয় ঐক্য ছাড়া এ চক্রান্ত মোকাবেলা করা যাবে না।’

তখন আওয়ামী লীগ দলীয় চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের এ বক্তব্য গ্রহণ করতে পারলে হয়তো আমরা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হারাতাম না।

আজ রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। রাজনীতি আজ অসৎ ব্যবসায়ী ও দুষ্ট চক্রের হাতে বন্দী। আজকে যারা প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন, রাজনৈতিকভাবে শোষিত মানুষের পক্ষে তাঁর বক্তব্যগুলো অনুধাবন করতে পারেন তাদের উচিত সম্মিলিতভাবে গরিব-দুঃখী মানুষের মুক্তির যে রাজনীতি সেই রাজনীতিকে অগ্রসর করে নেয়া। বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার একটি দেশ। শুধুমাত্র সুস্থ রাজনীতির চর্চা হলে, দলের চেয়ে দেশ বড়ো এই চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনীতিকে গতিশীল করতে পারলে এদেশে হতে পারে সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার মতো কিংবা তার চেয়েও উন্নত।

লেখক: সম্পাদক, নতুন বাংলা

এ জাতীয় আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020 Mohajog