1. sardardhaka@yahoo.com : adminmoha :
  2. mohajog@yahoo.com : Daily Mohajog : Daily Mohajog
  3. nafij.moon@gmail.com : Nafij Moon : Nafij Moon
রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৭:৪১ অপরাহ্ন

নবজাতক ও মাতৃসেবায় পিছিয়ে পড়ছি

মহাযুগ নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৩১ জুলাই, ২০১৬
  • ৯০ বার

স্টাফ রিপোর্টারঃ

পিংকি বেগমের সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানকে নিয়ে পরিবারের এক বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসব কক্ষ থেকে নবজাতক ইউনিটে ছুটছেন। বাইরের পরিবারের অন্য সদস্যদের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা। মিনিট দশেক পর বৃদ্ধা ফিরে এলেন শিশুটিকে বুকে চেপে। ততক্ষণে শিশুটি মৃত।

পিংকির পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিশুটি নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্মেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩৭ সপ্তাহ গর্ভে থাকার আগে জন্ম নিলে সে সময়ের আগে জন্মানো শিশু ‘প্রি-টার্ম বেবি’। জরায়ুর ভেতর এসব শিশুর বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ওজন কম হয়।

জাতিসংঘ শিশু তহবিলের বিশ্ব শিশু পরিচিতি-২০১১ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি হাজারে ২২টি শিশু সময়ের আগে কম ওজন নিয়ে জন্মায়। ১১% শিশু অপরিণত বয়সে জন্ম নেয়া ও কম ওজনের কারণে মারা যায়। সংক্রমণে মারা যায় ৩৪%। সংক্রমণে মারা যাওয়া শিশুদের অর্ধেকেই অপরিণত অবস্থায় জন্মায়। নবজাতক মৃত্যুর অন্যতম কারণ সময়ের আগে অল্প ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া। এছাড়া দরিদ্রতার কারণে বস্তি এলাকার পরিবারগুলোতে শিশুরা ভূগছে পুষ্টিহীনতায়।

২.
হাসিনা খাতুন তার এক বছর বয়সী শিশু বেলালকে নিয়ে নগরীর একটি বস্তি এলাকায় থাকেন। তিনি শিশুকে কোলে নিয়ে খই ভাজছিলেন। এমন সময় বেলাল খাবারের জন্য কেঁদে ওঠে। তিনি বেলালকে ভাতের সাথে লবণ মিশিয়ে খাওয়ান। তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় সব সময়ই আমার শিশুকে লবণ মিশিয়ে খাওয়াই। কারণ আমার ইচ্ছা থাকলেও শিশুর জন্য মাংস, মাছ অথবা ডাল সংগ্রহ করতে পারি না। আমাদের কোনো নিজস্ব জমি নেই।’ হাসিনা খাতুনের স্বামী দিনমজুরি করে। হাসিনা খাতুন জানান, বেলাল অধিককাল সময় নিউমোনিয়ায় ভোগে।

অন্যদিকে একই বস্তিতে বসবাসকারী কবিরের মা রহিমা বেগম জানান, আমার ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও ১৪ মাস বয়সী কবিরকে মাছ-মাংস খাওয়াতে পারি না। মাঝে মাঝে ডিম অথবা ডাল খাওয়ানো সম্ভব হয়। তবে মাঝে মাঝেই শিশুকে গরুর দুধ অথবা পাউডার দুধ খাওয়াই। রহিমা বেগম বলেন, ‘কবির অনেক সময় নিউমোনিয়ায় ভোগে।’

৩.
বিডিএইচএম-২০১১ এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৯ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। ৫ বছরের কম বয়সি যত শিশু মারা যায় তার শতকরা ১৪জন নিউমোনিয়ায় এবং ৮জন ডায়রিয়ায় মারা যায়। প্রতি ৩টি শিশুর মধ্যে ১টি শিশু প্রতিবছর নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে শতকরা মাত্র ৩৫জন উপযুক্ত চিকিৎসার সুযোগ পায় এবং ১৭জন কোনো চিকিৎসাই নেয় না। নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া জনিত ৬৬ শতাংশ মৃত্যুই সময় মত সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। তাই নিউমোনিয়া প্রতিরোধে এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে জাতীয় নবজাতক স্বাক্ষ্য কৌশল-২০০৯ অনুযায়ী, ৩৪ সপ্তাহের নিচে ও ১৮০০ গ্রামের কম ওজন নিয়ে জন্মালে সেই শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে তো নয়ই জেলা হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। এমনকি নবজাতক ও মাতৃসেবা সদনগুলোতে চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই।

৪.
জাতিসংঘ শিশু তহবিলের বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি-২০১১ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি হাজারে জীবিত জন্মে ২২টি শিশু, সময়ের আগে কম ওজন নিয়ে জন্মায় ১১ শতাংশ শিশু, অপরিণত জন্ম ও কম ওজনের কারণে সংক্রমণে মারা যায় ৪ শতাংশ। সংক্রমণে মারা যাওয়া শিশুদের অর্ধেকই অপরিণত অবস্থায় জন্মায়। নবজাতক মৃত্যুর অন্যতম কারণ সময়ের সাথে অল্প ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া।

জাতীয় নবজাতক স্বাস্থ্য কৌশল-২০০৯ অনুযায়ী, ৩৪ সপ্তাহের নিচে ১৮০০ গ্রামের কম ওজন নিয়ে জন্মালে শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু পরিবার এক্ষেত্রে খুবই কম কার্যকর ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ১-৩, ৬, ১৮, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭ এ মৌলিক স্বাস্থ্য ও শিশু কল্যাণ সম্পর্কে বলা হয়েছে। শিশুরা সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য অর্জন এবং অসুস্থতায় চিকিৎসা সুবিধা ও স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের সুবিধা লাভের অধিকার পাবে। কোনো শিশু যাতে করে স্বাস্থ্য পরিচর্যা সেবা লাভে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। সমাপনী পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নবজাতক ও শিশুরা মৃত্যুর হার কমানোর থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্যসেবাসহ সব ধরনের সুবিধা ভোগ করবে।

৫.
নবজাতক ও মাতৃসেবা এবং সার্বিক পুষ্টি পরিস্থিতি বিষয়ে জানুযায়ী-জুন ২০১২ তে জাতীয় সংবাদপত্র থেকে মোট ৭২টি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, নবজাতকদের যে সেবা পাওয়ার কথা তারা তা পাচ্ছে না। অন্যদিকে খাদ্যের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে সাধারণ খাবার তালিকা কাটছাট করতে হয়। তখন শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পড়ে হুমকির মুখে।

দেশে পুষ্টি পরিস্থিতির এমন বেহাল দশা দেখে পুষ্টিবিদরা বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের জন্য দ্রুত পুষ্টি যোগান সহায়ক কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে বাজারের গুড়ো দুধ সম্পূর্ণ জীবনুমুক্ত নয়। বাংলাদেশের যে শিশুরা গুড়ো দুধ খায় তারা ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, অপুষ্টি, কানপাঁকা, হৃদরোগ ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয় বেশি। অসাধু কোম্পানিগুলো পণ্যের লেবেলের গায়ে শিশুখাদ্যের প্রয়োজনীয়তা, গুণগত মান সম্মত (নকল) লেবেল ব্যবহার করে গ্রাহকদের প্রতারিত করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

৬.
দেশে শিশুখাদ্য আইন ১৯৮৪ থাকলেও এর কোনো প্রয়োগ নেই। বিভিন্ন এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বৈষমের শিকার হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। বরং এই বৈষম্য দিন দিন বেড়ে চলছে। বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা বাড়াতে বিশেষ করে জন্মের আগে ও পরে শিশু ও তার মায়ের পরিচর্যার বিষয়টি গুরুত্বসহ বিবেচনায় আনতে হবে।

বাংলাদেশে ২০টি শিশুকেন্দ্র থাকলেও সেখানে চিকিৎসা ও চিকিৎসার উপকরণের ব্যাপক অপ্রতুলতা দেখা দিয়েছে এবং অধিকাংশ মানুষ শিশু পুষ্টি সম্পর্কে জানে না। প্রায় ৮০ লক্ষ শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বাংলাদেশে অসুস্থ ও অপুষ্টির শিকার শিশুর হার এখনো বেশি। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।

শেষকথা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি থাকা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম। এখনো প্রতিদিনই ১৩০-১৪০ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। বছরে গড়ে প্রায় ৫০ হজার শিশু মৃত্যুবরণ করে ডায়রিয়ায়। অন্যদিকে দেখা যায়, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি গণমাধ্যম মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো, শিশু ও কিশোরদের সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। কিন্তু আমরা দেখছি, বেসরকারি গণমাধ্যমগুলোতে এই বিষয়ে বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার পরিবর্তে কৃত্রিম শিশুখাদ্যের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা চালানো হয়। অনেক সময় তা শিশু স্বাস্থ্যের পক্ষে উপযোগী কিনা তা বিবেচনাও করা হয় না। তাই বর্তমান সময়ে আমরা কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবে নবজাতক ও মাতৃ স্বাস্থ্যসেবায় পিছিয়ে পড়ছি।

এ জাতীয় আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020 Mohajog