1. sardardhaka@yahoo.com : adminmoha :
  2. mohajog@yahoo.com : Daily Mohajog : Daily Mohajog
  3. nafij.moon@gmail.com : Nafij Moon : Nafij Moon
বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:১৫ অপরাহ্ন

প্রকৃতির নান্দনিক অনুষঙ্গ ফড়িং

মহাযুগ নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭
  • ৪৪৯ বার

নিউজ ডেস্ক: ফড়িং একটি দৃষ্টিনন্দন পতঙ্গ। পুকুর, নদী কিংবা অন্যান্য জলাভূমির কাছে ফড়িংয়ের ওড়াউড়ি বেশি চোখে পড়ে। অনেক সময় গাছের ডালে, পাতার ওপর নিশ্চলভাবে বসে থাকে। ছোট শিশুরা ফড়িংয়ের পেছন পেছন ছুটে খুব মজা পায়, চুপি চুপি ফড়িংয়ের লেজ বা পাখার স্পর্শে মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। গ্রামের শিশুরা ফড়িংয়ের লেজে সুতা বেঁধে আকাশে ওড়ায়, বাঁশের কঞ্চি বা পাটকাঠির আগায় ঝিকর গাছের আঠা লাগিয়ে ফড়িং ধরে মজা পায়; কিন্তু প্রকৃতিতে ফড়িংয়ের বিচরণ অবাধ করতে শিশুদের এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে বড়দের শিক্ষা দিতে হবে।

ফড়িং (Dragonfly) ও সুচ ফড়িং (Damselfly) ওডোনাটা বর্গের অন্তর্গত, এনিসোপ্টেরা ও জাইগোপ্টেরা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত পতঙ্গ। এদের বৃহৎ যৌগিক চোখ, দুই জোড়া স্বচ্ছ পাখা এবং দীর্ঘায়িত ও খণ্ডায়িত শরীর রয়েছে। সাধারণত ফড়িংয়ের মাথা বড় হয় এবং ইচ্ছেমতো চারদিকে ঘুরানো যায়। এরা বসে থাকলে এদের পাখা শরীরের সঙ্গে সমকোণ অবস্থায় থাকে। অন্যান্য পতঙ্গের মতো ফড়িংয়ের ছয়টি কাঁটাযুক্ত পা আছে, পাগুলো ডালপালায় বসার উপযোগী। কাঁটাযুক্ত পা দিয়ে এরা যে কোনো গাছের ডালকে আঁকড়ে ধরে বিশ্রাম নিতে পারে। ওড়ার সময় এরা বাতাসে স্থির থাকে, আবার ধীরে থেমে থেমে সামনের দিকে এগোতে থাকে। এছাড়াও ফড়িং উড়ন্ত অবস্থায় থেকে হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে তার সম্পূর্ণ বিপরীত দিকেও দ্রুত উড়ে যেতে পারে। আবার এরা পাখার গতি বাড়িয়ে দ্রুত ডানে-বাঁয়ে দিক পরিবর্তন করতে পারে। ফড়িংয়ের দ্রুত উড়তে পারে মূলত ডানার পেশির সঞ্চালনের ফলে। অন্যদিকে পায়ের বিশেষ সঞ্চালনের জন্য ফড়িং স্থির অবস্থা থেকে হঠাৎ উড়তে পারে। কোনো কোনো ফড়িং ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটারেরও বেশি বেগে উড়তে পারে। ফড়িংয়ের এ বিচিত্র ওড়ার গতি ও বেগ দেখে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে হেলিকপ্টার তৈরি করেছিলেন। প্রকৃতির মধ্যে ফড়িংই একমাত্র পতঙ্গ, যার চেহারা, ওড়ার গতি ও বেগের সঙ্গে মিল আছে হেলিকপ্টারের।

শুধু অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব দেশেই ফড়িং দেখা যায়। বিশ্বে ইতিমধ্যে প্রায় ৬ হাজার প্রজাতির ফড়িং শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতে প্রায় ৫০০ প্রজাতির ফড়িং আছে। বাংলাদেশে আছে প্রায় ১৫০ প্রজাতির। দেশের সব অঞ্চলে ফড়িং দেখা যায়, তবে পাহাড়ে ও পাথুরে জলাশয়ের পাশে ভিন্ন রঙের বৈচিত্র্যময় ফড়িংয়ের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে ফড়িংয়ের প্রজাতিবৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক লেক, পুকুর, ডোবা ও জলাশয় আছে। ক্যাম্পাসে ফড়িংয়ের বৈচিত্র্যও রয়েছে। এখানে দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ফড়িং ও সুচ ফড়িং দেখা যায়। ফড়িংয়ের মধ্যে কমন পিকচার উইং, পাইড প্যাডি স্কিমার, কোরাল টেইল্ড ক্লাউডউইং, ডিচ জুয়েল, গ্রেটার ক্রিমসন গ্লাইডার, লিটল ব্ল– মার্শ হাউক, রুফাস মার্শ গ্লাইডার, গ্রিন মার্শ হাউক, কমন ক্লাব টেইল উল্লেখযোগ্য।

সুচ ফড়িংয়ের মধ্যে অরেঞ্জ টেইল্ড মার্শ ডার্ট প্রজাতিটি সারা বছরই দেখা যায়। এরা দেখতে খুবই সুন্দর। এছাড়াও ব্ল্যাক কিèড ফেদেরলেগস প্রজাতিটি প্রকৃতিতে বেশি সংখ্যক থাকায় এদের সারা বছরই পাওয়া যায়। এছাড়াও রয়েছে ব্লু ঘ্রাস ডার্ট, করোম্যানডাল মার্শ ডার্ট, প্রুনোসেড ডার্লেট, পিগমি ডার্লেট এবং ইন্ডিয়ান হুডেট ডার্লেট। ফড়িং সারা বছর দেখা গেলেও প্রকৃতিতে খাবার (অন্যান্য পোকা-মাকড়) বেশি থাকে বলে জুন-নভেম্বর মাসে বেশি চোখে পড়ে।

পূর্ণাঙ্গ ফড়িং পানি ও পানিতে থাকা ঘাসে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে লার্ভার জন্ম হয়। তারপরও পানির ভেতরই এর নিম্ফ বড় হতে থাকে। নিম্ফ যখন বিভিন্ন পর্যায় পার হয়ে পূর্ণাঙ্গ ফড়িংয়ের রূপ পায় তখন এরা ডাঙায় উঠে আসে। এ কারণেই ফড়িং সাধারণত পানির কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করে।

পূর্ণাঙ্গ ফড়িং খাদ্যশৃংখলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সার্বিক বিবেচনায় এরা পরিবেশবান্ধব। ফড়িং মূলত বিভিন্ন শস্যের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে খাদ্যশৃংখলে ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যে অঞ্চলে ফড়িং বেশি দেখা যায় সেই অঞ্চলের পরিবেশ ততো ভালো।

পূর্ণাঙ্গ ফড়িং সাধারণত দেখা যায় পুকুর, ডোবা, লেক, পাহাড়ি ঝরনা ও জলাভূমির আশপাশে। এরা মূলত পোকা-মাকড় যেমন- মশা, মাছি, মৌমাছি, পিঁপড়া, প্রজাপতি ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে। অন্যদিকে এদের লার্ভা, যা কিনা পানিতে বাস করে এবং নিম্ফ হিসেবে পরিচিত, এরা খাদ্য হিসেবে মশার লার্ভা ও অনান্য কীটপতঙ্গের লার্ভা খেয়ে জীবন ধারণ করে। মশা দমনে বিশেষ করে এডিস মশা (ডেঙ্গু জ্বরের বাহক) দমনে ভারত, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডে ফড়িংয়ের ব্যবহার আশাব্যঞ্জক। এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পোকা ও ফসলের ক্ষতিকর পোকা দমনে ফড়িংয়ের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

দেশের সব অঞ্চলে ফড়িং দেখা গেলেও এদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত কমছে। বিশেষ করে জলাশয় ভরাট হওয়া এর অন্যতম কারণ। এছাড়া কল-কারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য, ফসলের ক্ষেতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারে ফড়িংয়ের জন্মস্থান অর্থাৎ পানি দূষিত হওয়াসহ বহুবিধ কারণে কমে আসছে ফড়িংয়ের সংখ্যা।

প্রকৃতির এক নান্দনিক ও গুরুত্বপূর্ণ পতঙ্গ হচ্ছে ফড়িং। তাই ফড়িং রক্ষায় সবার সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে ফড়িংয়ের ডিম পাড়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও এর নিম্ফ বৃদ্ধির জন্য জলাশয়, পুকুর, ডোবা এগুলো যেন ভরাট এবং এর পানি যাতে দূষিত না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব ফড়িংয়ের উপকারী দিকগুলো অবগত করে তাদের সচেতন করে তুলতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ জাতীয় আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020 Mohajog