1. sardardhaka@yahoo.com : adminmoha :
বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১০:১৪ পূর্বাহ্ন

আরও ভূমিধ্বসের আশঙ্কা

মহাযুগ নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জুন, ২০১৭
  • ১৭৭ বার

প্রতিবেদক : কয়েকদিনের টানা বর্ষণের ফলে চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসের পর বঙ্গপোসাগরে আবার নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই নিম্নচাপের প্রভাবে বর্ষণ হলে আবারও ভূমিধ্বস হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী মঙ্গলবার ভোর থেকে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার জেলায় ভূমিধ্বসে অন্তত ১৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ জন সেনাবাহিনীর সদস্য।

বাংলা পঞ্জিকায় বর্ষা ঋতুর প্রথম মাস আষাঢ় মাস শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার থেকে ।  তবে মৌসুমী বায়ু উপকূল পেরিয়ে দেশের ভেতরে বিস্তৃত হয়েছে বেশি কিছুদিন আগেই। আষাঢ়ের শুরুতেই নিম্নচাপের প্রভাবে ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় সমুদ্র বন্দরে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম বিভাগে বুধবারও অতি ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়ে আবহাওয়াবিদরা পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ভূমিধসের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার ভূমিধ্বসের পর সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলে। রাতে বৃষ্টি ও আলোর স্বল্পতার জন্য বুধবার সকাল থেকে উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়। বুধবার বিকেল পর্যন্ত অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তাদের সন্ধানে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও স্থানীয় লোকজন কাজ করছেন। এ পর্যন্ত রাঙামাটি থেকে ১০৬ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ২১ জন, চন্দনাইশে তিনজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং খাগড়াছড়ি থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

ইইউ রাষ্ট্রদূতের শোক
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি নিহত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। প্রয়োজনে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব উপশমে ইইউ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন এই রাষ্ট্রদূত।

সরকারের ত্রাণ সহায়তা

ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য জরুরি মুহূর্তে ৫০ লাখ টাকা, ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ৫০০ বান্ডিল টিন সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বুধবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ ঘোষণা দেন।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেতুমন্ত্রী হেলিকপ্টারে করে রাঙামাটি এলাকায় আসেন। বান্দরবান ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা তিনি পরিদর্শন করবেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার আগে রাঙামাটি সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি কথা বলেন। এ সময় পাহাড়ধসে রাঙামাটিতে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে জরুরি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন।

 

ভূমিধ্বস ঠেকাতে বিশেষজ্ঞদের মত

ভয়াবহ এই ভূমিধ্বসের পেছনে বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর প্রতিকারে কি করা যায় সে সম্পর্কেও  কিছু পরিকল্পনার কথাও বলেছেন তারা।  বন উজাড়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ এবং ভূকম্পন বা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ফাটলের সঙ্গে ভারি বর্ষণ যোগ হওয়াকে বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় ভূমি ধসের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এমন ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এখনই মহাপরিকল্পনা নিতে সরকারকে তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশ থেকে লোক সরানো ও তাদের পুনর্বাসন, ফাটলের ঢালে বিশেষ বলয় তৈরি ও পানি সরাতে ক্যানেল নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে।
দুর্যোগ মোকাবেলায় আগে ব্যাপক সবুজায়ন, পাহাড় কাটা বন্ধ ও দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় দক্ষ লোকবল গড়ে তোলার পরামর্শ দেন একজন ভূতাত্তিক ও একজন জিআইএস বিশেষজ্ঞ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার গত এক দশকে ভারি বর্ষণের সময় ভূমি ধসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, নানা সময়ে ভূকম্পনের কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকায় পাহাড়ি এলাকায় ছোট ছোট ফাটল রয়েছে। ছোট ছোট ফাটল থাকা মানেই পাহাড়ের উঁচুতে ভূমি ধসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
“ভারি বর্ষণে এ ফাটলগুলোয় পানির চাপ বেড়ে যায়, অভিকর্ষজ নিম্নমুখী টান এবং পিচ্ছিলতায় দ্রুত ভূমি ধস ঘটছে।”
চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের ভূমিধস প্রবণ এলাকার ’১৫-২০টি’ পয়েন্টে গবেষকদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন অধ্যাপক হুমায়ুন। তিনি বলেন, “রিমোট সেন্সিংয়ের মাধ্যমে আমরা কিছু এলাকা চিহ্নিত করেছি। বেসরকারিভাবে কিছু কাজ হয়েছে, এখন সরকারিভাবে ভূমি ধস এলাকা চিহ্নিত করতে হবে।
“বর্ষার আগে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরাতেই হবে। ভূমি ধসের পর যাতে রাস্তা ব্লক না হয়, সে প্রটেকশন নিশ্চিতে নির্দিষ্ট এলাকায় লোহার নেট দিতে হবে।” ২০০৭ সালের পর প্রতি বছর বর্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাসিন্দাদের অনাগ্রহের কারণে তা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বলে মঙ্গলবারই এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়া মন্তব্য করেন।
শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ের ছোট ফাটল এলাকায় সিমেন্ট দিয়ে শিলাখণ্ডের সংযুক্তি মজবুত করার পরামর্শও দেন অধ্যাপক হুমায়ুন।
পাহাড়ে অবাধে বসতি স্থাপন ও গাছপালা কেটে ফেলায় ভূমি ধসের প্রবণতা বেড়েছে, বলেন তিনি।
এই অধ্যাপক বলেন, “পার্বত্য এলাকায় যত্রতত্র রাস্তা বানানো এভয়েড করতে হবে। ইতোমধ্যে যেসব এলাকা দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন রাস্তা করার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পরিহার করতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমি ধসে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এসময় উদ্ধার কাজ করতে গিয়ে নতুন করে বিপদ ডেকে আনে। মঙ্গলবারও পার্বত্য এলাকায় একই ঘটনা ঘটেছে।

১৯৯৭ সালে জিআইএস পদ্ধতি ব্যবহার করে খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার জেলায় ১৬০টি ভূমিধসপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। ১৯৯৮-২০০০ সালে বান্দরবান সদর উপজেলা ও রাঙামাটি শহরে ভূমিধসের উপর বেশি কাজ হয়েছে।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইস) এর পরিবশে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কে বি সাজ্জাদুর রশিদ বলেন, পাহাড়ের মাটি এতেই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে যে ভারি বর্ষণেই ভূমি ধস হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও এ দুর্যোগ থাকবে। তবে কার্যকরি পরিকল্পনা নিতে হবে।
“সরকারকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে। বিশেষ করে ভূমি ধস ঠেকাতে মহাপরিকল্পনা নেওয়ার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতের পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থার জন্য প্রকল্প নিতে হবে। ভালনারেবল স্লোপগুলোতে ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্রাকচার নিতে হবে। ব্যয়বহুল হলেও পানি দ্রুত সরে যাওয়ার জন্যে বিশেষ ক্যানেলও নেওয়া যেতে পারে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ অধ্যাপক মনে করেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনবসতি করতে না দিলেই জানমালের এ ক্ষয়ক্ষতি শূন্যের কোটায় আনা সম্ভব।
“মানবসৃষ্ট দুর্যোগটি মানুষকেই যথাযথ পরিকল্পনা নিয়েই বাস্তবায়ন করতে হবে। রানা প্লাজা ধস কিংবা ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলার মতো প্রস্তুতি রাখতে হবে, যা ভূমি ধসের উদ্ধার কাজেও সহায়ক হয়।”

 

এ জাতীয় আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020 Mohajog